গত বছর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, শুধু তাপজনিত অসুস্থতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে এবং অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার, যা জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ। প্রতিবছর পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে একটি প্রশ্ন উঠে আসে– শ্রমজীবী মানুষের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
সারাবিশ্বে সমাদৃত বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের অসীম অবদান। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মক্ষম শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৩৫ লাখ, যার প্রায় ৩৪ শতাংশ নারী। এই বিপুল শ্রমশক্তির ৮৪ শতাংশ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে নেই চুক্তি, নেই সুরক্ষা। কর্মরত নারীদের মধ্যে এই হার ৯৬.৬ শতাংশ। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২ বলছে, প্রায় ১৮ লাখ শিশু এখনও শিশুশ্রমে আটকে আছে। কিন্তু এত বিশাল বৈচিত্র্যপূর্ণ শ্রমশক্তির শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্য কোনোটিই নীতি নির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৬ জন শ্রমিক। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৩৫। গত এক দশকে মারা গেছেন ৮ হাজারের বেশি, যাদের বেশির ভাগই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী, পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী।
রোগের দ্বৈত বোঝা
সংক্রামক ও অসংক্রামক দুই ধরনের রোগ শ্রমিকের মধ্যে ক্রমবর্ধমান। ঘনবসতিপূর্ণ আবাস ও কর্মক্ষেত্রে যক্ষ্মা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এখন গ্রামীণ ও শহুরে কায়িক শ্রমে নিয়োজিত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে খুবই সাধারণ বিষয়।
দরকার বিশেষ যত্নের
তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মাত্র ২৫ শতাংশ মাতৃত্বকালীন ছুটি পায়। অনেকে প্রসবের আট সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই কাজে ফিরতে বাধ্য হন। গর্ভকালীন হালকা কাজ, বিশ্রাম বা পুষ্টির ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। অথচ মায়ের সুস্থতা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের কর্মক্ষমতার ভিত্তি।
প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের প্রয়োজনও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত
কর্মক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা অভিগম্যতার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় স্থায়ী প্রতিবন্ধী হলে পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। শ্রমিক-ঘন এলাকায় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য র্যাম্প, বিশেষ টয়লেট বা সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবস্থা থাকে না। শ্রমনীতিতে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের বিশেষ প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যে নজর নেই
সাভারে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক শ্রমিকদের ৫৯ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতা এবং ৭৪ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগের লক্ষণ রয়েছে। নারী শ্রমিকদের মধ্যে এই হার পুরুষের তিন গুণ।
চাকরি হারানোর ভয়, অপ্রতুল মজুরি, কঠোর তদারকি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা– এসব মিলিয়ে শ্রমিকের মানসিক চাপ বহুমাত্রিক। এ চাপগুলোকে আমরা প্রায়ই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। মানসিক সমস্যা এখনও সামাজিক ট্যাবু হওয়ায় শ্রমিকরা চিকিৎসা নিতে আসেন না।
রাষ্ট্র ও শিল্প খাতের ভূমিকা
ফিরে আসি শুরুর কথায়: একজন অসুস্থ শ্রমিক রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতার ক্ষতি আর সুস্থ শ্রমিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এ বোঝাপড়া থেকেই নির্ধারিত হওয়া উচিত রাষ্ট্রের করণীয়।
কর্মক্ষেত্রে তাপ নিয়ন্ত্রণ, বিশুদ্ধ পানি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামের জায়গা এবং কর্মঘণ্টার যুক্তিসংগত সীমা– এসব বিষয় এখন আর ঐচ্ছিক থাকতে পারে না। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কর্মক্ষেত্রভিত্তিক স্ক্রিনিং চালু করতে হবে। শ্রমিকের স্বাস্থ্যকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। শুধু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নয়; শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যকে শ্রমনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।
শিল্পকারখানাকে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু উৎপাদন নয়; শ্রমশক্তির সুস্থতা নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।
শ্রমিক-ঘন এলাকায় স্থানীয় সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান মিলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র গড়তে হবে। যেখানে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও থাকবে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা আইনত ও কার্যত নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকের স্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রের ভাবনা একটি মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত; উন্নয়ন আসলে কী? উন্নয়নের কেন্দ্রে যদি মানুষ না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই নয়। বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে, তখন দীর্ঘ মেয়াদে অসুস্থ, মানসিকভাবে ক্লান্ত ও অর্থনৈতিকভাবে নিরাপত্তাহীন শ্রমশক্তি দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।
সুস্থ শ্রমিক রাষ্ট্রের সম্পদ। তাঁর শারীরিক সুস্থতা, মানসিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার– সবই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অধ্যাপক ড. রুমানা হক: অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, আর্ক ফাউন্ডেশন



