বাংলাদেশ যখন তামাকমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চায়, ঠিক সেই সময়েই নতুন এক নীতিগত সিদ্ধান্ত আমাদের উল্টো পথে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। দীর্ঘদিন আলোচনার পর এই সংশোধনী জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি দৃঢ় বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা বাদ পড়ায় সেই প্রত্যাশা অনেকটাই ম্লান হয়েছে। আর আমরা সম্মুখীন হয়েছি একটি মৌলিক প্রশ্নের: রাষ্ট্র কি জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে; নাকি রাজস্ব ও বাণিজ্যিক স্বার্থের চাপে নীতিগত আপস করে নতুন এক ঝুঁকির দরজা খুলে দিচ্ছে?
বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণের পথচলা একদিকে অগ্রগতির, অন্যদিকে সংগ্রামের। ২০০৫ সালের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে আমরা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছি। জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি), গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে গ্রাফিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং গণস্থানে ধূমপান নিষিদ্ধকরণের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমপাওয়ার কৌশলের বিভিন্ন উপাদানে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, বিশেষত স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা, নজরদারি এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও লাভ করেছে বাংলাদেশ।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ছিল ৪৩.৫ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে কমে প্রায় ৩৫.৫ শতাংশে নেমেছে। তবুও বাস্তবতা হলো, দেশে এখনও প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে এবং প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত কারণে প্রাণ হারায়। অর্থাৎ অর্জনের বিপরীতে সংকট এখনও গভীর ও বহুমাত্রিক।
২০২৫ সালের বৈশ্বিক তামাক শিল্পের হস্তক্ষেপ সূচকে (গ্লোবাল টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি ইন্টারফেয়ারেন্স ইনডেক্স) বাংলাদেশ ৬৯ স্কোর নিয়ে ১০০ দেশের মধ্যে ৬৬তম অবস্থানে রয়েছে, যা উচ্চমাত্রার হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। আরও উদ্বেগজনক হলো, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে আইন সংশোধনের সময় এই হস্তক্ষেপ সক্রিয়ভাবে প্রভাব ফেলেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এই সূচক শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি দেখায় কীভাবে শিল্প স্বার্থ জনস্বাস্থ্যনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। তামাকশিল্পের কৌশল বহুস্তরীয়: কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লবিং, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি, এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত তৈরি। তাই সংশোধনী থেকে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং নিষেধাজ্ঞা বাদ পড়া কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি বৃহত্তর প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবেই দেখা উচিত।
এখানে রাজস্ব বনাম জনস্বাস্থ্য বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয়, তামাক খাত থেকে সরকার বিপুল রাজস্ব আয় করে, যা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যুক্তি আংশিক ও বিভ্রান্তিকর। প্রথমত, তামাক ব্যবহারজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতার ক্ষতি এবং অকালমৃত্যুর অর্থনৈতিক বোঝা, রাজস্ব আয়ের চেয়ে বহু গুণ, যা ইতোমধ্যে অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে। দ্বিতীয়ত, যদিও পরিমাণে সহনীয় এবং নিয়ন্ত্রিত, বাংলাদেশে কর ফাঁকি ও অবৈধ বাণিজ্যের সমস্যা বিদ্যমান। দুর্বল নজরদারি, জাল ট্যাক্স স্ট্যাম্প এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার কাঠামোর কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। ফলে ‘রাজস্ব রক্ষা’র যুক্তি বাস্তবে অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বনাম রাজস্ব– এই বিতর্কে অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব তার নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি সেই দায়িত্বের অংশ। যদি কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদি রাজস্বের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে, সেটি টেকসই নয়, ন্যায্যও নয়।
এই বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পণ্য তরুণদের লক্ষ্য করে ডিজাইন ও বিপণন করা হয়। বিভিন্ন ফ্লেভার, আকর্ষণীয় ডিভাইস, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে এগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। গবেষণা দেখাচ্ছে, এগুলো নিকোটিনে আসক্তির প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে এবং পরে প্রচলিত তামাক ব্যবহারে রূপান্তরের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশের বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনও এই নতুন ধরনের বিপণন ও পণ্যের বিস্তার মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞা না থাকলে নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিকভাবে একটি শক্তিশালী উদাহরণ স্থাপন করেছে। এ অবস্থান ধরে রাখতে হলে নীতি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, জনস্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নীতি প্রণয়ন কেবল আইনগত পরিবর্তন নয়। এটি একটি মূল্যবোধের প্রতিফলন। আর তাই এ সংশোধনী আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে: রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নাকি স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি নিচ্ছে? একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি। জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
ড. এস এম আব্দুল্লাহ: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা পরিচালক, আর্ক ফাউন্ডেশন, ঢাকা;
ড. রুমানা হক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, আর্ক ফাউন্ডেশন, ঢাকা


